প্রতি বছর ২৩শে জুন বাঙালি জাতি এক শোকাবহ দিন পালন করে, যা পলাশী দিবস নামে পরিচিত। এই দিনটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়, যেদিন বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। ১৭৫৭ সালের এই দিনে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করেন। তরুণ নবাব শুরু থেকেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধূর্ত পরিকল্পনা এবং দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তের মুখোমুখি হন। ব্রিটিশরা বাণিজ্যিক সুবিধার আড়ালে বাংলায় নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। অপরদিকে, নবাবের খালা ঘসেটি বেগম, প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান, রাজবল্লভ, জগৎ শেঠের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার লোভে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
পলাশীর যুদ্ধ: প্রহসনের এক লড়াই
ষড়যন্ত্র যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধূর্ত কর্মকর্তা রবার্ট ক্লাইভ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে নবাবের বিশাল বাহিনীর সাথে ব্রিটিশদের ক্ষুদ্র বাহিনীর মোকাবেলা হয়। নবাবের সৈন্য সংখ্যা ব্রিটিশদের চেয়ে অনেক বেশি হলেও, প্রধান সেনাপতি মীরজাফর এবং তার অনুগত সৈন্যরা যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাদের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাবের অনুগত সেনাপতি মীর মদন এবং মোহনলালের বীরত্বপূর্ণ লড়াই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যুদ্ধের নামে যা হয়েছিল, তা ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত প্রহসন।
বৃষ্টির কারণে নবাবের গোলার্ধ ভিজে গেলে এবং মীর মদনের আকস্মিক মৃত্যুতে নবাব হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। এই সুযোগে মীরজাফরের পরামর্শে তিনি যুদ্ধবিরতির আদেশ দেন, যা ছিল একটি মারাত্মক ভুল। এরপর রবার্ট ক্লাইভের নির্দেশে ব্রিটিশ বাহিনী নবাবের অপ্রস্তুত শিবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সহজেই জয় লাভ করে।
পরাজয়ের কারণ ও ফলাফল
পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মূল কারণ ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। দেশীয় প্রভাবশালী অমাত্যদের ক্ষমতার লোভ এবং ব্রিটিশদের কূটকৌশল এই পরাজয়কে অনিবার্য করে তোলে। এই যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী এবং ভয়াবহ।
* স্বাধীনতার অবসান: এই পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয় এবং ব্রিটিশ শাসনের সূচনা ঘটে।
* রাজনৈতিক পট পরিবর্তন: মীরজাফরকে নামেমাত্র নবাবের মসনদে বসানো হলেও, প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে। এর মাধ্যমে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
* অর্থনৈতিক শোষণ: ব্রিটিশরা বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন শুরু করে। তাদের শোষণের ফলে এককালের সমৃদ্ধ বাংলা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে।
* সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়: ব্রিটিশ শাসন বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পলাশী দিবসের শিক্ষা
পলাশী দিবস শুধুমাত্র একটি পরাজয়ের দিন নয়, এটি একটি শিক্ষণীয় দিন। এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অভ্যন্তরীণ শত্রু ও বিশ্বাসঘাতকতা বাইরের শত্রুর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হতে পারে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য এবং দেশপ্রেমের গুরুত্ব অপরিসীম।
আজ, পলাশীর সেই ট্র্যাজেডির ২৬৮ বছর পরেও, এই দিনটি আমাদের আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা এবং জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। পলাশীর ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ চলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।