বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে বিশেষত আরব মুবাল্লিগ, ব্যবসায়ী ও সুফিয়ায়ে কেরামের মাধ্যমে। তাদের ভাষা ছিল আরবি, ফারসি। এদেশের অধিবাসীরা ছিল একেতো সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষাভাষী, অপর দিকে বেশিরভাগই ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসনে শিক্ষাবঞ্চিত। ইসলামের সাম্য ও মানবতাবাদী দর্শনের আবেদনে মোহিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেও বাপ-দাদার বংশানুক্রমিক ধর্মের বিভিন্ন আচার, কুসংস্কার ও সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়ে গিয়েছিল তাদের জীবনাচারে। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির অভিযানের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলায়। কিন্তু সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা ইসলামি আদর্শে পুরোপুরি অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে বারবার ক্ষমতার অস্বাভাবিক পালাবদল, বিদ্রোহ, অস্থিরতা ও অনেক ক্ষেত্রে শাসকশ্রেণির উদাসীনতায়।
.
পলাশীর বিপর্যয়ের পর প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে স্তব্ধ হয়ে যায় ইসলামি সমাজের বিকাশ। এরপর একে একে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ও বঞ্চনার শিকার হয়ে বন্ধ হয়ে যায় দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্রগুলো। আলিমগণ নিগৃহীত হতে থাকেন সর্বত্র। বিকৃতি ও কুসংস্কার ঝেঁকে বসে সর্বত্র; এমনকি ধর্মীয় মহলেও। সেসব কুসংস্কার গ্রাস করে নেয় মুসলিম জনসমাজকে। রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে নির্বাসিত হয়ে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার মর্যাদা হারিয়ে পরিণত হয় অন্যান্য ধর্মের মত কতিপয় আচার ও প্রথাসর্বস্ব ধর্মে। ইসলাম অনুসরণের গণ্ডি সীমিত হয়ে পড়ে শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত পর্যায়ে। এই পরিবর্তিত পরিবেশে জাগতিক স্রোতের অনুকূলে গা ভাসায় আলিমদের কেউ কেউ। আর যারা তখনও সংস্কারের অবিরাম প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন, আধুনিক জাহিলিয়াতের সর্বগ্রাসী প্লাবন মোকাবিলায় তারাও ছিলেন অসহায় প্রায়।
.
নৈরাশ্যজনক এমন পরিস্থিতিতেই গত শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বিশ্বব্যাপী ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের যে সূচনা হয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলায়ও তার ঢেউ এসে লাগে। এ আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা পূরণে আরবি, উর্দু ও অন্যান্য ভাষায় রচিত হতে থাকে ইসলামি জীবনব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের ওপর প্রয়োজনীয় গ্রন্থাদি। কিন্তু উপমহাদেশের বৃহৎ ভাষা বাংলায় পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত ইসলামি জীবনব্যবস্থার ওপর তেমন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রামাণ্য গ্রন্থ রচিত হয়নি। অথচ ইসলামি পুনর্জাগরণের কর্মতৎপরতায় জনশক্তি সরবরাহের দিক থেকে বাংলাদেশের জমিন শহিদে বালাকোট সাইয়েদ আহমদ বেরলভির মুহাম্মাদি আন্দোলন থেকে ফরায়েজি আন্দোলন পর্যন্ত সবর্দা উর্বর প্রমাণিত হয়েছে।
.
এমনই একটি যুগসন্ধিক্ষণে সময়ের প্রয়োজনেই যেন মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীমের মতো অসামান্য প্রতিভার অধিকারী, কালজয়ী গবেষক ও সাহিত্যিকের অনিবার্য আবির্ভাব ঘটে। বাংলা ভাষায় আধুনিক রীতিতে ইসলামি সাহিত্য চর্চার ধারাটির সূচনা ও অগ্রযাত্রায় দক্ষ ও কুশলী হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাওলানা আবদুর রহীম। তাঁর শক্তিমান লেখনী, ক্ষুরধার যুক্তি, আধুনিক মানস ও যুগজিজ্ঞাসার জবাব সম্বলিত রচনা খুব দ্রুত বাংলা ভাষায় ইসলামচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
.
মাওলানা আবদুর রহীম ছিলেন একাধারে শীর্ষস্থানীয় আলিম, রাজনীতিবিদ, সংগঠক, সুবক্তা ও সাহিত্যিক। তাঁর বহুবিধ পরিচিতির মধ্যে চিন্তাবিদ-গবেষক-সাহিত্যিক পরিচয়টিই অধিকতর সমুজ্জ্বল। চিন্তার মৌলিকত্ব, জীবনের প্রায় সব বিভাগের ওপর অতলস্পর্শী গবেষণা ও উচ্চাঙ্গের সাহিত্য রচনা-ই তাকে কালজয়ীর আসনে সমাসীন করেছে। বাংলা ভাষায় সাহিত্যাঙ্গনে ইসলামচর্চায় তিনি তাঁর সময় থেকে এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে আসীন।
.
মানবজীবনের প্রায় প্রত্যেক বিভাগ-- কী অর্থনীতি, কী রাজনীতি, পরিবারিক জীবন, নারী অধিকার, ইতিহাস, দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব, সংস্কৃতি, শিক্ষা, তুলনামূলক মতবাদ প্রভৃতি বিষয়ে তিনি সমান পারদর্শীতায় তাঁর কলমের ধার প্রমাণ করেছেন। তাঁর সাহিত্যে উচ্চাঙ্গের ভাষা ব্যবহার, আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির প্রয়োগ, যুগজিজ্ঞাসার ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান তাকে নিয়ে গিয়েছে অনন্য উচ্চতায়। মাওলানা আবদুর রহীমের রচনাসম্ভার সংখ্যার দিক দিয়েও দীর্ঘতর-- ৬০টি মৌলিক গ্রন্থ ও ৬০টি অনুবাদ গ্রন্থ মিলে প্রায় ১২০টি।
.
প্রায় চার দশক ইসলাম ও ইসলামি আন্দোলনের খিদমতে অক্লান্ত শ্রম বিনিয়োগকারী এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন ১৯৮৭ সালের ১ অক্টোবর। বৃহস্পতিবার। ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২:২০টা। মগবাজারস্থ রাশমনো ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মাওলানার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছরের কিছু বেশি। মাওলানা আবদুর রহীম স্ত্রী, আট ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে যান। পর দিন বাদ জুমা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমে জানাযা হয়।
.
৩৩ বছর আগে আজকের এই দিনে বাংলাদেশ তার এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছে। কিন্তু আজও যেন তিনি তাঁর ইলমে জারিয়া নিয়ে আমাদের কাছে সজীব হয়ে আছেন। ইলম আর ইখলাসের শক্তি এমনই অপ্রতিরোধ্য সবুজ।
লেখকঃ মুহাম্মদ আবু সুফিয়ান ( প্রকাশক প্রচ্ছ্বদ প্রকাশন)