
“আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভর্ৎসনা করি বিধির বিধান।”
আজ ২৪ মে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে এই পঙ্ক্তিগুলো যেন সময়কে চিৎকার করে মনে করিয়ে দেয়— নজরুল কেবল এক কবি নন, এক বিপ্লব, এক দর্শন, এক ভাষ্য। তাঁর জন্ম হয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ভাষা হয়ে ওঠার জন্য। আজকের বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী যখন অস্থিরতা, বৈষম্য আর বিদ্বেষে ঘিরে ধরছে মানুষকে, তখন নজরুলের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিবাদ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
যে কবিতা শুধু শিল্প নয়, অস্ত্রও
১৯২২ সালে প্রকাশিত বিদ্রোহী কবিতার কয়েকটি লাইন আমাদের আজও শিহরিত করে:
“মহাকালের আমি চির-দ্রুম
আমি মানুষের চির-আকাশে ঝলক দেওয়া বিজলী।”
এই কবিতায় নজরুল তাঁর স্বাধীন চিন্তাভাবনাকে দৃঢ়তার সাথে প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে, সেই চিন্তাভাবনা দিয়ে তিনি সমাজের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর কবিতার ভাষা চিরকালীন, কণ্ঠটি যেন আজও এই শহরের দেয়াল জুড়ে ধ্বনিত হয়।
ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে মানবতার সওয়াল
আজ যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক বিষ আমাদের সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করছে, নজরুল তখন গেয়ে ওঠেন—
“গাহি সাম্যের গান —
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান”
তিনি ছিলেন সেই দুর্লভ কণ্ঠ, যিনি কোরআনের ছায়ায় যেমন গান লিখেছেন, তেমনি কালীসঙ্গীতও গেয়েছেন পরম শ্রদ্ধায়। তিনি মানুষকে ধর্ম দিয়ে বিভাজন না করে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন।
নারী, শ্রমিক, প্রান্তিক মানুষের কবি
নজরুলের আরেকটি বিপ্লব ছিল নারী অধিকারের প্রশ্নে। তিনি বলেন:
“দুনিয়ার যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
তিনি ছিলেন সেই যুগে, যখন নারী কণ্ঠস্বর ছিল মূক, আর মর্যাদা ছিল পরাধীনতার ছায়ায় ঢাকা। নজরুল সেই নীরবতার বিরুদ্ধে শব্দের খঞ্জর ছুঁড়ে দেন।
শ্রমজীবী মানুষের কথাও নজরুল তুলে ধরেন এমনভাবে, যা কালের গণ্ডি পেরিয়েও চিরন্তন:
“দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি বলে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”
আজকের সমাজে নজরুল কোথায়?
আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন পরিচয়ের সংকট, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও সামাজিক বৈষম্যের মুখোমুখি, তখন নজরুলের কণ্ঠ তাদের দেয় প্রতিবাদের সাহস। তাঁর কবিতা শুধুই সাহিত্যচর্চার বিষয় নয়, তা হয়ে উঠতে পারে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা। তাঁর কণ্ঠ ছিল নিপীড়িতের কণ্ঠস্বর, তাঁর কবিতা ছিল ন্যায়ের জন্য যুদ্ধের এক নির্মল ঘোষণা। এই কণ্ঠ যেন হারিয়ে না যায় সভা-সেমিনারের শিরোনামে, বরং ফিরে আসুক আমাদের প্রতিদিনের সাহসী উচ্চারণে।
আবুল খায়ের
ডিআইইউ প্রতিনিধি