"বনভোজনে পাখিরা সব আসছে ঝাঁকে ঝাঁক
মাঠের ধারে আমার ছিলো চড়িভাতির ডাক"
রবীন্দ্রনাথের সেই চড়িভাতি কবিতাটি মনে আছে? যারা গ্রামীণ শৈশব কাটিয়েছে, তাদেরকে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিদের কাছে নিয়ে যায় এই কবিতা। শহুরে ছেলেমেয়েদের কাছে যা পিকনিক বা বনভোজন, গ্রামের চির সবুজ, স্নিগ্ধ পরিবেশে তার নাম চড়ুইভাতি। তবে যে নামে আর যে পরিবেশেই হোক না, চড়ুইভাতি যে সবার প্রাণে জাগায় নির্মল আনন্দ তা তো বলাই বাহুল্য।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার চাপ আর যান্ত্রিক জীবনের যাঁতাকল থেকে নিজেদেরকে খানিক সময়ের জন্য রেহাই দিতে সেই নির্মল আনন্দ জাগিয়ে তুলেছে নোবিপ্রবি সাইন্স ক্লাব। তুমুল আনন্দ-উল্লাস, গান-গল্প আর রান্নাবান্নার আয়োজনের মধ্য দিয়ে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়েছে নোবিপ্রবি সাইন্স ক্লাবের প্রথম চড়ুইভাতি। দীর্ঘদিনের নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে গত ৫ ডিসেম্বর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের(নোবিপ্রবি) নীলদিঘীর পাড়ে আয়োজিত হয় এই আনন্দ উৎসব।
নোবিপ্রবি সাইন্স ক্লাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল বিভাগেরই শিক্ষার্থী রয়েছে। এত সব বিভাগের ভিন্ন ভিন্ন ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব, প্রেজেন্টেশন, এসাইনমেন্ট সবকিছু মিলিয়ে সবার জন্য সুবিধাজনক সময় নির্বাচন করাটাই ছিলো চড়ুইভাতির সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। ক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্যদের আগ্রহ ও উদ্দীপনার ফলেই নানামুখী চাপের ভেতর দিয়েও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় চড়ুইভাতির আয়োজন। নোবিপ্রবি সাইন্স ক্লাবের সভাপতি হানিয়া বিনতে আসলাম জানান,
"এটা একটা ভিন্নধর্মী আয়োজন করার চেষ্টা করা হয়েছে। সবসময় তো আমরা খুব জটিল সব সায়েন্সের বিষয় এবং রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, একটা দিন একটু নিজেরা আনন্দ করা।
আর কাজের মাধ্যমে আমাদের কমিটির সকলের মধ্যে যে বন্ধন তৈরি হয়েছে তা আমাদের সামনের অনুষ্ঠানগুলো সুন্দর ও সফল করবে ইনশাল্লাহ।"
চড়ুইভাতি আয়োজনের প্রথম ও প্রধান কাজ ছিলো সবার কাছ থেকে চাঁদার টাকা আদায় করা। সেই কাজে দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে আয়োজনকে সাফল্যমণ্ডিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা।
আনুষঙ্গিক সকল কাজে দলবেধে সবাই অংশগ্রহণ করে স্বদ্যোগে ও আগ্রহের সাথে । মূল আয়োজনের আগেরদিন বিকেলে কাঁচা-বাজার করতে চলে যায় এক দল৷ সেই দলেরই একজন, প্রাণীবিদ্যা বিভাগের মাহমুদ তাওসিফের কাছে তার অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, "এক কথায় অসাধারণ অনুভূতি!
আসলে বাজারটা করেছিলাম অন্যান্য সময় যে বাজার করা হয় অনেকটা সেটার মতোই তবে ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা কাজ করছিল৷ রনি ভাইয়ের সিটি ছিল পরদিন, তাও সে সন্ধ্যায় বাজারে তিনি গেছেন৷ চাচ্ছিলেন সায়েন্স ক্লাবের চড়ুইভাতির বাজারটা নিজ হাতে করার জন্য৷"
পরদিন সকাল সকাল বাবুর্চির সাথে রান্নার স্থানে হাজির হয় অনেকে। বাবুর্চি যখন রান্না করছে, তাকে সহযোগিতা করছে কয়েকজন। কেউ পানি আনছে, কেউ লাকড়ি টেনে দিচ্ছে আর কেউ বা আবার বসার জায়গা পরিষ্কার করছে। কয়েকজন একপাশে বসে গাজর-শসা টুকরো করতে করতে বুনছে গল্পের জাল। কেউ কেউ আবার গানের সুরে মাতিয়ে রাখছে সবাইকে। আর এইসব স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তোলায় তুমুল ব্যস্ত কেউ কেউ। তারাও সুযোগমত সহযোগিতা করছে বিভিন্ন কাজে। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!
এভাবেই সদস্যদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশে রান্নার আয়োজন সম্পন্ন হয়৷ একে একে উপস্থিত হয় ক্লাবের নবীনতম সদস্যরা। চড়ুইভাতির আয়োজনে মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিতে যোগ দেন ক্লাবের উপদেষ্টা শিক্ষকমন্ডলী অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর ফিরোজ আহমেদ, পরিবেশ ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুস সালাম,
ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ আমজাদ হোসেন এবং বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ মফিজুল ইসলাম প্রমুখ। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তারা শিক্ষার্থীদের সাথে খাওয়াদাওয়া করেন। খাওয়া-দাওয়া শেষে গ্রুপফটো সেশনেও অংশগ্রহণ করেন।
খাওয়া-দাওয়া আর আনুষ্ঠানিক ছবি তোলা শেষে পুকুরপাড়ের স্নিগ্ধতায় বসে আড্ডার আসর। হেমন্তের হিমহিম বিকেলের নির্জনতা ভেঙে সকলে একই সুরে সজীব করে তুলে মুহূর্তগুলো। সন্ধ্যা নামতে নামতে জ্বালানো হয় ক্যাম্প ফায়ার। আগুনের উষ্ণ তাপের চারপাশ ঘিরে চলে খালি গলায় গাওয়া গানের আসর। হাসি-আনন্দ আর হৈ-হুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় একদিনের এই আনন্দ-আয়োজন। দলবেধে গান করতে করতে রাতের ক্যাম্পাসের পথ ধরে সবাই ফিরে যায় নিজ নিজ গন্তব্যে।
আবিদা সুলতানা