দেশ সংযোগবিশেষ প্রতিবেদনসাহিত্য সংযোগ

বাহের দেশের রাজবংশী বা রংপুরী ভাষা

বাহের দেশের রাজবংশী বা রংপুরী ভাষা জনসংযোগ

কেউ বলেন রংপুরী ভাষা, কারো কাছে আবার পরিচিত রাজবংশী ভাষা হিসাবে। রংপুরের এই আঞ্চলিক ভাষাটি বাংলাদেশে রংপুরী, ভারতে রাজবংশী, কামতাপুরী, গোয়ালপারীয়া ও সূর্যাপুরী এবং নেপালে রাজবংশী ও তাজপুরি ভাষা নামেও পরিচিত। যেখানে যে নামেই পরিচত হোক না কেন,ঐতিহ্যবাহী এই ভাষার রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। প্রাচীন ইন্দো-আর্য ভাষা পরিবার ভুক্ত কামপুরী ভাষার একটি অংশ- এই রংপুরী ভাষা।

আঞ্চলিক ভাষা হিসাবে বাংলাদেশসহ ভারত ও নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এটি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের ৮টি জেলা, ভারতের উত্তরবঙ্গের সকল জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগের বেশি মানুষ, নেপালের ঝাপা ও মোরং জেলা এবং ভূটানের কিছু অঞ্চলে এই ভাষার প্রচলন রয়েছে। সবমিলিয়ে পৃথিবীর প্রায় দেড় কোটি মানুষের মাতৃভাষা এবং প্রায় ২ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের কথ্য ভাষা হিসেবে এই ভাষার প্রচলন রয়েছে।

রাজবংশী, নাথ-যোগী, তাজপুরিয়া, খেন, নস্যশেখ সম্প্রদায়ের লোকেরা রংপুরী ভাষার প্রচলন করেছিলেন। অতীতে রংপুর জেলা ছিল বৌদ্ধদের শেষ লীলাভূমি। বঙ্গের অন্যান্য প্রদেশ থেকে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে পালিভাষা বিতাড়িত হলেও কামরূপে তা জায়গা করে নিয়েছিল। হিমাচলের পরপারে যাত্রার সময়ে এই ভাষার যে ক্ষীণ প্রতিধ্বনি তা থেকেই রাজবংশী ভাষার উৎপত্তি।

রাজবংশী বা রংপুরী ভাষার পূর্ব, মধ্য, পশ্চিম এবং পাহাড়ী উপভাষা রয়েছে। এই ভাষা ব্যবহারকারী অধিকাংশ জনগণ দ্বিভাষী। সাধারণত রংপুরী ভাষাভাষীরা একইসাথে রংপুরী, প্রমিত বাংলা তথা অসমীয়া ভাষায় কথা বলে অভ্যস্ত। রংপুরী বা রাজবংশী ভাষার নিজস্ব লিখন পদ্ধতি রয়েছে। এক্ষেত্রে পূর্ব নাগরী লিপি ব্যবহার করা যায়।

রংপুরকে বলা হয় ’বাহের দেশ’। বাইরের মানুষের ধারণা ’বাহে’ ব্যবহারকারী অঞ্চলের মানুষেরা বোকা, অমার্জিত আর সভ্যতার অগ্রযাত্রা থেকে পশ্চাৎপদ। তবে বাস্তবে এ ধারণা অপূর্ণ এবং অসঙ্গত। রংপুর অঞ্চলের প্রচলিত ভাষার আছে রীতিসম্মত ধারাবাহিকতা। আর এই ভাষা, বাংলা ভাষার আদি স্তরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। ’বাহে’ শব্দটিও ধারাবাহিকতার ফল। মূলত ’বাহে’ শব্দটি সম্বোধনসূচক। আর বাস্তবতা হলো ’বাহে’ শব্দটির সাথে গভীর মমত্ব আর স্নেহের আন্তরিক অনুভূতির প্রকাশ সম্পর্কিত।

রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে হয়েছে অনেক সাহিত্য চর্চা। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে ’নেজাম পাগলার কেচ্ছা’য়, অষ্টাদশ শতকের কবি হেয়াত মামুদ এবং নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার রচনায় রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা লক্ষ্য করা যায়। প্রখ্যাত নাট্যকার নলডাঙ্গার তুলসী লাহিড়ী ’ছেঁড়াতার’ নাটকে সফলভাবে রংপুরের আঞ্চলিক ভাষা উপস্থাপন করেছেন। এছাড়াও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক ’নূরলদীনের সারাজীবন’ কাব্য নাটকে, ছান্দসিক কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ ’হামার অমপুর’ কাব্যগন্থে, আনিসুল হকের ’নাল পিরান’ নাটকে রংপুরী ভাষা পরিলক্ষিত হয়েছে।

বর্তমানে শিক্ষা প্রসারের কারণে রংপুরী ভাষার মিশ্রণ ঘটছে শুদ্ধ বাংলার সাথে। শিক্ষিতের হার বৃদ্ধির জন্য রংপুরের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। কারণ, শিক্ষিতদের অনেকেই মনে করেন, স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করা মর্যাদাহানিকর বিষয়। তবে বাস্তবে এ উৎকন্ঠা নিতান্তই অমূলক। কুন্ঠার সব দেয়াল ভেঙ্গে সবাইকে বেরিয়ে আসা উচিৎ। যথাযথ গবেষণা ও অধিক চর্চায় মনোযোগী হলেই সবাই জানবে রংপুরের ভাষা আছে- আছে গর্বিত ভাষাতাত্তি¡ক ধারাবাহিকতা এবং বিপুল শব্দসম্ভার।

বাংলা ভাষা গঠনে রংপুরী ভাষার প্রভাবের কথা ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, দীনেশ চন্দ্র সেনসহ অনেক পন্ডিত ব্যক্তিত্ব নানা উদাহরণে প্রমাণ করেছেন। ফলে কোন দিক থেকেই রাজবংশী ভাষাকে উপেক্ষা করা যায় না। বরং রংপুরী তথা রাজবংশী ভাষা নিয়ে গর্ব করার মতো আছে অনেক স্মৃতি আর উপাখ্যান।

লেখক: আলিফ রহমান বিজয়

আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন এখানে

এ সম্পর্কিত আরও খবর

আপনার পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিন এখানে
Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker