আজ শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের জন্মদিন স্মরণিকা-আয়োজন নেই কোথাও
- সময়: ০৫:৩১:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ নভেম্বর ২০২৩
- / ৫১

কুমিল্লা প্রতিনিধি :- আব্দুল্লাহ
বাঙালি জাতির মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে যিনি তৎকালীন গণ অধিকার পরিষদে প্রথম সাহসী দাবি জানিয়েছিলেন তিনি ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। মাতৃভাষা বাংলা আন্দোলন থেকে বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ রোপিত হয় এই দাবির মধ্য দিয়ে। জাতির এই সূর্যসন্তান ২ নভেম্বর ১৮৮৬ সালে তৎকালীন ত্রিপুরার অংশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইলে জন্মগ্রহন করলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন কুমিল্লায়। তার বসতভিটা কুমিল্লা নগরীর বাদুরতলায়।
ধীরেন দত্তের কলেজ জীবন, পরিবার- চাকুরি এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্ম বিসর্জন সবই এই কুমিল্লায়। শহীদ ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লার মাটি ও মানুষের সন্তান। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে ধীরেন দত্তের অবদান সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে অবিস্মরণীয়। মহান এই ব্যক্তির জন্ম দিনে কুমিল্লায় কোথাও তাকে স্মরণ করা হয় নি। নেয়া হয় নি সরকারি-বেসরকারি কোন আয়োজন।
ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ১৯০৬ সালে কুমিল্লা কলেজ (কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ) থেকে তার কলেজ জীবন শেষ করেন। সে বছরই কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার পূর্ব ধইর গ্রামের সুরবালা দাসকে বিয়ে করেন। কর্মজীবনের প্রথমে তিনি কুমিল্লার বাঙ্গুরা উমালোচন হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আইন ব্যবসার জন্য তিনি ১৯১১ সালে তিনি কুমিল্লা বারে যোগ দেন। কুমিল্লার অভয়াশ্রমের সাথে তিনি প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৩৬ সালে ত্রিপুরা জেলা বোর্ড(বর্তমান কুমিল্লা) এর সদস্য নির্বাচিত হন।
বর্তমানে কুমিল্লা জেলা স্টেডিয়ামের নাম করন করা হয়েছে – ভাষা সৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত স্টেডিয়াম নামে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে কুমিল্লার ইতিহাসবিদ আহসানুল কবির বলেন, বাঙালি জাতি সত্ত্বার অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের একটি অনন্য নাম বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। তাঁর দেখানো পথেই আমাদের রক্ত¯œাত স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জন্মদিন কিংবা মৃত্যুদিন কোনটি রাষ্ট্রীয় ভাবে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পালিত হয় না। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক। কুমিল্লাবাসী হিসেবে আমাদের দৈন্যতা কারণ তাঁর প্রতি অবহেলা অনাদর অযতœ আমাদের ঐতিহ্যের অতীতকে ভুলিয়ে দিবে
দ্যা ডেইলি স্টার এর কুমিল্লা প্রতিনিধি খালিদ বিন নজরুল বলেন, বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত শুধু কুমিল্লার বিষয় নয়, তিনি বাংলাদেশ তথা সারা বিশে^ বাংলা ভাষাভাষি মানুষের গর্বের প্রতিনিধিত্ব করেন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য এপর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোন পৃষ্ঠপোষকতা আসে নি। আমার জোর দাবি, রাষ্ট্রীয় ভাবে ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের সাথ সংশ্লিষ্ট দিবসগুলো যেন পালন করা হয়। এতে মানুষ ইতিহাস ভুলে না গিয়ে – প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবে।
ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে প্রথম ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকে মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানিয়ে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় মাতৃভাষা বাংলা অধিকার আদায়ের আন্দোলন। বায়ান্ন’র একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আমার মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা পাই।
সেই অধিবেশনের শুরুতে পূর্ব বাংলা কংগ্রেসের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, ‘বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা হলেও সমগ্র পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি বাঙালি। অথচ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার যে ভূমিকা পালন করেছে তা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়।’ সেদিন তিনি এমন যুক্তি ও সাহসী কথা বলেছিলেন।
বিভিন্ন প্রবন্ধে উল্লেখ হয়েছে, পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন তা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তথা সামরিক জান্তা ভোলেনি, ভুলতে পারেনি। তার অকুতোভয় ভূমিকাই যে পাকিস্তানকে দ্বিখ-িত করার বীজ বপন করেছিলেন তা পরবর্তী সময়ে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে, প্রমাণিত হয়েছে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্বাধীনতা সংগ্রামেও অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ছাত্ররা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য পতাকা উত্তোলন করে। এরপর তিনি নিজ হাতে কুমিল্লার বাড়িতেও তুলেছিলেন পতাকা। এর কয়েকদিন পর তার রক্তে সিঞ্চিত হয় দেশের মাটি।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বাসা থেকে রাতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ৮৫ বছরের ধীরেন্দ্রনাথকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নির্যাতন করে জীবন কেড়ে নেয় পাক হানাদার বাহিনী। ধীরেন দত্তের কনিষ্ঠ সন্তান দীলিপ দত্তও পাক হানাদার বাহিনীর হাতে প্রাণ হারান।
Discover more from জনসংযোগ
Subscribe to get the latest posts sent to your email.














