পলাশবাড়ীতে লাইসেন্সবিহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রমরমা ব্যবসা: স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ
- সময়: ০১:১৫:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
- / ৫১

রাসেল মাহামুদ (স্টাফ রিপোর্টার): গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ক্লিনিকগুলোর ওপর সিভিল সার্জনের নজরদারি কিছুটা বাড়লেও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ব্যাপারে প্রশাসনের রহস্যজনক উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলা সদরে প্রায় ১৫ থেকে ১৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠলেও হাতেগোনা দু-একটি ছাড়া কারোরই বৈধ লাইসেন্স নেই। লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠানে ভুয়া ডাক্তার, অদক্ষ জনবল এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিত ও নিঃস্ব হচ্ছে।
দালাল সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, পলাশবাড়ীর ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো মূলত দালাল নির্ভর। গ্রামগঞ্জ থেকে নিরীহ রোগীদের ভুল বুঝিয়ে এসব সেন্টারে নিয়ে আসার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী দালাল নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে, দালালদের খুশি রাখতে এসব প্রতিষ্ঠান আলাদা খাওয়ার হোটেল খোলাসহ ফ্রিজ, টিভি, মোটরসাইকেল এবং এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা উপঢৌকন দিচ্ছে। দালালের মাধ্যমে রোগী এনে ৩ থেকে ৭ হাজার টাকার অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা (টেস্ট বাণিজ্য) করিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে।
চিকিৎসায় ভয়াবহ অনিয়ম ও প্রতারণা
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট ছাড়াই চলছে প্যাথলজি ও এক্স-রে কার্যক্রম। এক্স-রে রুমগুলোতে রেডিয়েশন থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয় প্রোটেকশন নেই, মাত্র ৫ ইঞ্চি গাঁথুনির দেয়ালে ঘেরা রুমে এক্স-রে করায় রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া, কিছু প্রতিষ্ঠানে স্যাম্পল কালেকশন বা টেস্ট না করেই মনগড়া ‘নরমাল রিপোর্ট’ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ভুয়া ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা প্রদান এসব সেন্টারের নিত্যদিনের চিত্র। পল্লী চিকিৎসকদের এমবিবিএস ডাক্তারের প্যাডে রোগী দেখা, এক ডাক্তারের ডিগ্রি নকল করে অন্য ডাক্তারের নামে চালানো এবং সাধারণ এমবিবিএস ডাক্তারকে ‘গাইনি বিশেষজ্ঞ’ সাজিয়ে রোগীদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। টেস্টের টাকার একটি নির্দিষ্ট অংশ কথিত ডাক্তারদের কমিশন হিসেবে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা. মুনতাসির মামুন শুভ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পলাশবাড়ীর ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর অপচিকিৎসা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি ভুয়া ডাক্তারদের বিষয়ে জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার মুখে সিভিল সার্জন অফিস থেকে ক্লিনিকগুলোতে কিছু অভিযান চালানো হলেও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। জনশ্রুতি রয়েছে, অসাধু উপায়ে ম্যানেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান টিকে আছে। সিভিল সার্জন অফিসে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তাদের জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স আছে। অথচ বাস্তবে ২/১টি ছাড়া বাকিগুলোর কোনো কাগজপত্র নেই। এমনকি ৫ বছর ধরে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সও নেই। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় প্রশাসন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই চলছে এই অনিয়ম।
জনগণের দাবি ও আল্টিমেটাম
স্বাস্থ্যসেবার নামে এমন নৈরাজ্যে চরম ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তাদের দাবি, অবিলম্বে সিভিল সার্জন ও উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এসব অবৈধ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায়, পলাশবাড়ীর সাধারণ জনগণ মানববন্ধনসহ কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।
Discover more from জনসংযোগ
Subscribe to get the latest posts sent to your email.














