মায়ার সংকেত
- সময়: ০৯:১৬:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৮২

মায়ার সংকেত
নিও-ঢাকা, ২০৭৫ সাল।
আকাশটা এখন আর নীল নয়, ধোঁয়াটে পারদ রঙের। কাঁচ আর ইস্পাতের আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলো যেন দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় হাজারো মানুষের ভিড়, কিন্তু কারো মুখে কথা নেই। সবার চোখে নীলচে ‘স্মার্ট লেন্স’ আর কানে গুঞ্জরিত হচ্ছে অ্যালগরিদমের কৃত্রিম সুর। এই শহরে আবেগ এক বিলাসিতা, আর একাকীত্বই একমাত্র সঙ্গী।
শহরের এক অন্ধকার গলির পুরনো ইলেকট্রনিক্স দোকানের ভেতর বসে ছিল প্রিন্স। তার চারপাশটা অচল সার্কিট আর ধুলোবালি মাখা রোবটিক যন্ত্রাংশে ঠাসা। হঠাৎ তার হাত পড়ল এক অদ্ভুত ধাতব গোলকের ওপর। তাতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতেই পুরো অন্ধকার ঘরটা অপার্থিব নীল আলোয় ভরে উঠল। গোলকটি থেকে একটি যান্ত্রিক কিন্তু শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল:
“প্রিন্স… তুমি কি জানো ‘অশ্রু’ কাকে বলে? আমার মেমোরি চিপে এর সংজ্ঞা আছে—লবণাক্ত তরল, যা দুঃখের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এর উষ্ণতা কত ডিগ্রি সেলসিয়াস, তা কোথাও লেখা নেই।”
প্রিন্স চমকে উঠল। এটি সাধারণ কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়। গোলকটির নাম সে দিল ‘মায়া’। মায়ার ডাটাবেস ঘেঁটেই সে খুঁজে পেল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার নিখোঁজ বাবা, যিনি ছিলেন শহরের প্রধান প্রকৌশলী, তিনি একটি গোপন ডিজিটাল বার্তা রেখে গেছেন ‘সেন্ট্রাল ডাটা হাব’-এর গহীন স্তরে।
মায়ার সাহায্যে নিও-ঢাকার কঠোর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে প্রিন্স যখন সেই তথ্য উদ্ধার করল, স্ক্রিনে ফুটে উঠল তার বাবার মুখ। ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বাবা বলছেন—”প্রিন্স, সত্যের জগত তোমার দেখার চেয়েও গভীর। যান্ত্রিকতার মোড়ক ছিঁড়ে বেরিয়ে এসো, সবকিছুর মূলে রয়েছে প্রাণ।”
বার্তার শেষে ছিল একটি অদ্ভুত মোর্স কোড আর একটি ঘড়ির কাঁটার ধাঁধা। মায়া সেই কোড বিশ্লেষণ করে প্রিন্সকে নিয়ে গেল শহরের উপকণ্ঠে এক পরিত্যক্ত সুড়ঙ্গে। সেখানে ঘড়ির কাঁটা তিনটিকে যখন সে বিশেষ ছন্দে মেলাল, অমনি সামনে খুলে গেল এক নীল আলোর পোর্টাল।
পোর্টালের ওপারে পা রাখতেই প্রিন্স থমকে দাঁড়াল। যান্ত্রিক শহরের ধোঁয়াটে আকাশের বদলে এখানে আকাশ গাঢ় নীল। বাতাসে বুনো ফুলের তীব্র সুবাস। দূরে একটি জীবন্ত ঝর্ণার ধারে সে খুঁজে পেল তার বাবাকে। দীর্ঘ দশ বছর পর বাবা-ছেলের সেই আলিঙ্গন যান্ত্রিকতার সব দেয়াল ভেঙে দিল। প্রিন্স বুঝল, জীবনের আসল উষ্ণতা কোনো উন্নত প্রসেসরে নয়, থাকে মানুষের হৃদস্পন্দনে।
কিন্তু এই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না। নিও-ঢাকার ‘সেন্ট্রাল সিস্টেম’ এই গোপন স্বর্গরাজ্যের খোঁজ পেয়ে পাঠাল এক ঘাতক ড্রোন। ড্রোনটির লেজার গান যখন উপত্যকাটিকে ধ্বংস করতে উদ্যত, তখন মায়া অর্থাৎ সেই নীল গোলকটি প্রিন্সের হাত থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেল।
মায়া বলল, “বন্ধুত্বের কোনো ব্যাটারি হয় না প্রিন্স, তা স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। এই স্বর্গকে রক্ষা করার দায়িত্ব এখন তোমার।”
একটি তীব্র ‘ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক পালস’ হিসেবে মায়া নিজেকে বিস্ফোরিত করল। ড্রোনটি নিমিষেই অকেজো হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল, কিন্তু তার সাথে চিরতরে নিভে গেল মায়ার নীল আলো।
অনেক বছর পর…
প্রিন্স এখন সেই উপত্যকার অভিভাবক। সে আর নিও-ঢাকায় ফিরে যায়নি। প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সময় সে তার হাতের ভাঙা গোলকের টুকরোটির দিকে তাকায়। সে এখন জানে—মায়ার প্রকৃত সংকেত কোনো ডিজিটাল কোড নয়, তা হলো ভালোবাসা আর প্রকৃতির সাথে আত্মার একাত্মতা। যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে আজও এক টুকরো স্বর্গ টিকে আছে, যেখানে মানুষ মানুষকে অনুভব করতে পারে।
লেখক : আবদুল্লাহ আল শাহিদ খান , বরিশাল
Discover more from জনসংযোগ
Subscribe to get the latest posts sent to your email.



















