পহেলা বৈশাখ রাজনীতি ও চাঁদপুর
- সময়: ১০:১৫:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ এপ্রিল ২০২৫
- / ১৩৪

আমার শহর চাঁদপুরে বৈশাখ পালন করা হতো না, বিশেষ করে গত চৌদ্দ বছর।
চাঁদপুরের এলিট শ্রেণির বাচ্চারা পড়াশোনা করতো চাঁদপুরের বিখ্যাত হাসান আলী স্কুলে আর মাতৃপীঠ স্কুলে। এসব বাচ্চাদের বাবা মা উচ্চশিক্ষিত ছিল, বেশিরভাগ সরিকারি চাকরি করতো। তারা গান করতো, বাদ্য বাজাতো, ছবি আঁকতো, নাটক করতো, নৃত্য করতো।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, এসবই চাঁদপুরের সমাজে নিষিদ্ধ। এই সকল ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাবে সরকার ধর্মীয় নেতাদের ফতোয়া অতিক্রম করতে পারে নি। উলটো, চাঁদপুরের রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনও এসব ফতোয়া মেনে চলতো।
চাঁদপুরে বাদ্য যন্ত্র বাজানো শিক্ষা, ছবি আঁকা, নাটক প্রশিক্ষণ, নৃত্য চর্চা চার দেয়ালের মধ্যে কঠোর প্রাসাশনিক নিরাপত্তার বলয়ে সীমাবদ্ধ ছিল। চাঁদপুর শিল্পকলা একাডেমীতে বহু অনুষ্ঠান হতো, এবং সামনে দিয়ে সবাই হেঁটে যেতো। কিন্তু কখনো এই শিল্পকলা একাডেমীতে আগ্রহ নিয়ে কেওই প্রবেশ করতো না। শিল্পকলা একাডেমীর কোন গল্প শিল্পকলা একাডেমীর দেয়াল অতিক্রম করে নি। উলটো সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় লোকজন আরো গালিগালাজ করে যেত।
এই মেরূকরণ আরো প্রকট হয় ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের পর।
২০১১ সালে চাঁদপুরের রহমতপুর কলোনীতে বেশ জাকজমকপূর্ণভাবে বৈশাখ উদ্যাপিত হলেও, ২০১২ এর পর এখন পর্যন্ত আর কোন বৈশাখ উদ্যাপন হয় নি। ২০১৩ সালের পর এটা একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে পড়ে যে, চাঁদপুরের মানুষ আর কখনো বৈশাখ উদ্যাপন করবে না।
আরেকটা স্কুল ছিল আল আমিন একাডেমী স্কুল এণ্ড কলেজ—আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান হলেও এলিট ক্লাস এখানে পড়াশোনা করতো না। এখানে পড়তো প্রবাসী শ্রমিকদের বাচ্চারা, যাদের বাবাদের আমরা অনেকে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে চিনি। এছাড়াও ছিল চাঁদপুরের ধার্মিক মধ্যবিত্ত পরিবারের বাচ্চারা।
প্রথম কারণ ছিল, এই স্কুলের ম্যানেজমেন্ট ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতো জামায়াতে ইসলামি। দ্বিতীয় কারণ ছিল, এই স্কুলের ছাত্ররা বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম প্ল্যাটফর্মগুলোতে কিছু আলাদা প্রথা-রীতিনীতি পালন করতো। যেমন, স্কুলের ছাত্ররা যখন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় যেত, তখন তাদের বিতর্ক প্রতিযোগিতার বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে সালাম দিতো—যেটা কিনা বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম বিতর্ক ইন্ডাস্ট্রিতে গ্রহণযোগ্য ছিল না। আমাদের পিটিতে জাতীয় সংগীতের আগে কুরআন তেলাওয়াত হতো। আরেকটা বিষয় ছিল “প্রার্থনা সঙ্গীত”—
ইন্টারেস্টিং না? অনেকটা খ্রিষ্টান গির্জার প্রার্থনা সংগীতের মতো শোনাচ্ছে না?
কিন্তু বিষয়টা একদম তা নয়। আল আমিন একাডেমীতে অমুসলিম শিক্ষার্থীদের ভর্তি নেওয়া হতো না। এটা শুধু মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্যই নির্ধারিত ছিল।
আমি ঢাকার মিশন স্কুলে পড়াশোনা করেছিলাম। সেখানে থাকতে শপথ বাক্য পড়ানো, সেই শপথ বাক্যের শেষ লাইনে একটা প্রার্থনা ছিল। ব্যাস, এই টুকুই।
কিন্তু আল আমিন একাডেমী স্কুলে এসে আমি একটা ভিন্ন চিন্তার সাথে পরিচিত হই।
আল আমিন একাডেমীতে শপথ বাক্যের বদলে প্রার্থনা সঙ্গীত পাঠ করানো হতো। আর সেই প্রার্থনা সঙ্গীত ছিল কবি গোলাম মোস্তাফার লেখা ‘হে খোদা দয়াময় রহমানুর রাহিম’ কবিতাটি। হ্যাঁ, কবি গোলাম মোস্তফা—যেই গোলাম মোস্তফা বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিমে একটা ট্যাবু হয়ে আছে শুধু তার রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে। সেই গোলাম মোস্তফাকে চর্চা করতো চাঁদপুরের আল আমিন একাডেমী। আল আমিনের ছাত্রদের বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রদের টুপি পরা বাধ্যতামূলক ছিল। আর ছাত্রী শাখার হাই স্কুলের মেয়েদের ইউনিফর্ম ছিল নীল বোরকা আর সাদা স্কার্ফ।
আমাদের স্কুলে যিনি পিটি করাতো, তার নাম ছিল শফিউর স্যার। তিনি স্কাউটিং করতেন। আল আমিন স্কুলের স্কাউটে উনার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তিনি আরেকটা গান গাইতেন সেটা হলো ‘বাদশাহ তুমি দ্বীন ও দুনিয়ার’। এই গানটি স্কাউটিং -এর প্রত্যেকটা প্রোগ্রামে গাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এক্ষেত্রে উনি নিজেই উদ্যোগ নিয়ে গান গাইতেন। এই সকল গানগুলো বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম প্ল্যাটফর্মগুলোতে অপরিচিত ছিল। চাঁদপুরে সেটা পরিচয় হয় আল আমিন একাডেমীর মাধ্যমে। আল আমিন একাডেমী গান প্রশিক্ষণ, চিত্রাঙ্কন চর্চা—সবই হতো। গানের জন্য ‘মোহনা শিল্পিগোষ্ঠী’ ছিলো, যারা কিনা ইসলামী গান শেখাতো। মোহনা শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা বিভিন্ন মাহফিল ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গান গাইতো। চিত্রাঙ্কন বলতে শুধুমাত্র গ্রামের দৃশ্য, গাছ-লতাপাতা আর ক্যালিগ্রাফি ডিজানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। একসাথে আধুনিক ও ইসলামি পাঠ্যক্রমের ফলে চাঁদপুরের সাধারণ মানুষের মাঝে এটা ব্যাপক সাড়া ফেলে। চাঁদপুরে সকল মধ্যবিত্তরা আল আমিন একাডেমীতে তাদের বাচ্চাদের ভর্তি করায়। বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য অভিভাবকরা গ্রাম ছেড়ে সদরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে বাচ্চার পড়াশোনার জন্য।
আল আমিন একাডেমীর দেখাদেখি অনেক প্রাইভেট স্কুল হয়, যারা আল আমিন একাডেমীকে নকল করে নিজেদের কারিকুলাম সাজায়। এটাই ছিল চাঁদপুর শহরে আল আমিন একাডেমীর লিগ্যাসি।
আর পহেলা বৈশাখ পালন করা তো দূর কি বাত, কেও এটা নিয়ে কথাই বলতো না। উলটো ঢাকার পহেলা বৈশাখ পালন করার বিষয়টাকে সবাই ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতো।
আমার শিক্ষক মোজাম্মেল স্যার তিনি পহেলা বৈশাখের ছুটির পরের ক্লাসে এসে বললেন, “সবাই এদিন পান্তা ভাত খায়। আর আমি আমার ফ্যামিলি গরুর গোশত দিয়ে পোলাও খেলাম। ভাবলাম বছরের পহেলা দিন, পরিবার নিয়ে একটু ভালো খাবার খাই৷ কোন গুনাহও হলো না, আবার সুস্বাদু আহার হলো।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো তে তারা মঙ্গল শোভাযাত্রা ও পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের ছবি দিয়ে তুলনা করতো। আর ক্যাপশনে লিখতো: “বাংলাদেশি চারুকলার বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ও পাকিস্তানি বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার।” ২০২১ সালে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের এক ইঞ্জিনিয়ার একটা স্পোর্টস গাড়ি বানায়, তখন ক্যাপশনে লেখা থাকতো: “চারুকলার বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ও মোল্লাদের আবিষ্কার।”
এটা ছিল তাদের প্রতিবাদ।
তারা কোনোভাবেই ভারতীয় আধিপত্যের কাছে মাথা নোয়ায় নি, সর্বদা তারা লড়াই করে গিয়েছে স্বাধীনতার জন্য, আজাদির জন্য।
আরেকটা মজার বিষয় ছিল—আল আমিন একাডেমীর বেশিরভাগ শিক্ষকরা ছিল শিক্ষক হওয়ার অযোগ্য ও অথর্ব। কিন্তু তারপরও চাঁদপুরের মধ্যবিত্তরা এই স্কুলেই নিজেদের সন্তানদের পাঠাতো, শুধু এই রকম একটা ইসলামি কালচার চর্চার কারণে।
যারা বিগত বছর গুলোতে এরকম কলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদী বাঙালি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় কাজ কতেছে, তারা সবাই শিক্ষিত এবং যোগ্য—এতে কোন সন্দেহ নেই।
এদের অনেকে প্রচুর সম্পদশালী।
কিন্তু এত শিক্ষা, যোগ্যতা, সম্পদ ব্যয় করেও কলকাতা কেন্দ্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী বাঙালি সংস্কৃতি বাংলাদেশের মানুষ গ্রহণ করে নি। চাঁদপুর সিপিবি বাসদের মানব বন্ধনগুলোতে শুধু বক্তা উপস্থিত হতো, আর দুইজন লোককে তারা ভাড়া করতো তাদের ফেস্টুন ধরার জন্য। এই একজন বক্তাই চাঁদপুরে সিপিবি কিংবা বাসদ করতো এবং সে চাঁদপুর সরকারি কলেজের কোন না কোন ফ্যাকাল্টির প্রফেসর। কিন্তু তার অহংকার ও প্রতিহিংসামূলক, বর্ণবাদী কলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদী বাঙালি বয়ানকে লোকজন ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করতো।
চাঁদপুরের লোকজন উলটো টাকা খরচ করে আল আমিনের অযোগ্য ও অথর্ব শিক্ষকের কাছে নিজের সন্তানদের শিক্ষার জন্য পাঠাতো।
আর বলতো ‘দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য।’
এভাবেই মানুষ তাদের লড়াই করে গিয়েছে ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে। ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্য চাঁদপুরে পরাজিত হয়। চাঁদপুরে তেরো সালের আন্দোলনে শহিদ সিয়াম শহিদ হন। চাঁদপুরে এই শহিদ যেমন সম্মান পায়, তা অবিশ্বাস্য। শহিদ সিয়াম শিবিরের সাথি ছিল। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে প্রশাসনের শিবির-বিরোধী ক্র্যাকডাউন চলমান থাকলেও, সিয়াম ফ্যাসিস্ট আমলেই চাঁদপুরের মানুষের কাছে শহিদের স্বীকৃতি পায়।
ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের ল্যাস্পেন্সাররা কখনো এই মর্যাদা অর্জন করতে পারে নি ও কখনোও পারবে না।কারণ তারা ইনসাফ মানবতায় বিশ্বাস করে না।
লেখক: মুহাম্মদ হাবিব ইবনে বেলাল
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
Discover more from জনসংযোগ
Subscribe to get the latest posts sent to your email.


















